1. fauzursabit135@gmail.com : S Sabit : S Sabit
  2. sizulislam7@gmail.com : sizul islam : sizul islam
  3. mridha841@gmail.com : Sohel Khan : Sohel Khan
  4. multicare.net@gmail.com : অদেখা বিশ্ব :
শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন

ডা. মোজাহিদুল হকের ধারবাহিক গল্প

ডা. মোজাহিদুল হক
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ মার্চ, ২০২২

পর্ব- ২০

আজকাল টের পাই একটা হালকা বিষন্নতা যেন আমাকে জড়িয়ে থাকে দিনভর। হেমন্তের বিকেলের কুয়াশার মতো। অথচ আমার এমনটা হবার কথা নয়। মধ্যবয়সি দুঃখ বিলাসী গৃহে আবদ্ধ নিঃসঙ্গ মানুষও বলা যাবে না আমাকে। যা যা আঁকড়ে ধরে মধ্য বয়সি একজন মানুষের মনে সুখের বোধ সঞ্চারিত হয়, সবই তো আমার করায়ত্ব। কিছু ভালো লাগেনা আমার। টিভি দেখতে না, গান শুনতে না। আড্ডা মারতে না, হইহই করতে না।  ভালো না লাগার এক জটিল আবর্তে যেন ঢুকে পড়েছি। বেরোনোর পথ পাচ্ছি না।

সকাল বেলা বিছানা ছাড়তে ইদানীং খুব আলস্য লাগে। অহনা অফিস চলে যায়। নিজ বানানো প্রভাতি  চা আমার চিরকাল প্রিয়, আজকাল সে চায়ের কাপে ঠোঁট ছুঁইয়েও তৃপ্তি পাই না।

হাসপাতালের জন্য বেরুতে হবে স্মরণে এলেই বুক শ্রাবণের মেঘে ছেয়ে যায়। আবার হাসপাতাল না থাকলে বিচিত্র এক অবসাদে কষটে মেরে থাকে মন। কী যে হল আমার?

নাহ্ এই বিচ্ছিরি শুকো রোগটাকে আর বাড়তে দেয়া উচিত নয়।

অহনা ফোন করেছে, দুপুরে খেতে আসব কিনা জানতে চাইলো আহ্লাদী গলায়। অহনার ফোন পেয়ে মনের কুয়াশা মাখা হেমন্তের বিকেলটা সরে গেছে। রিকশা থেকে নেমে গলির মুখে আসতেই দেখি স্মিত হেসে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে অহনা। বাচ্চা মেয়ের মতোই উদোমাদা ভঙ্গি। সরাসরি অহনার মুখের দিকে তাকালাম। অহনা মিটিমিটি হাসছে।

 

সব্জী কিনতে হবে। আগেই ফোনে জানিয়েছে অহনা। অহনা হাঁটছে ধীর পায়ে। আমার পাশে পাশে। দু’ধারের সব্জীর দোকানে থরে থরে সব্জী সাজানো। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে অহনা, তবে সে ভাবে কিছুই দেখছিল না। মধ্য ফাল্গুনের দুপুর, আকাশ আজ মেঘলা, রোদের তেমন তাপ নেই।

রান্নার তোড়জোড় করছে অহনা ঘড়ির কাঁটা দেড়টার ঘরে। দুটো পর্যন্ত লাঞ্চ আওয়ার। রান্না করে খেয়ে অফিস যেতে গেলে আজ আর অফিস যাওয়া হবে না অহনার। বললাম চলো রেস্তোরাঁয় খাই। অহনা জবাব না দিয়ে হাসলো আলতো। বাসার পাশে একটা রেস্তোরাঁয় চুঁইঝাল রান্না হয়। রেস্তোরাঁটা ঘুপচি মত নয়, বেশ বড়সড়ই। তবে কেমন অন্ধকার অন্ধকার। দু-দুখানা টিউবলাইট জ্বলছে,তাদেরও ভারী নিষ্প্রভ দেখায়।

এতক্ষণ ফাঁকা ফাঁকা ছিল, আবার লোকে সরগরম। অহনা আর আমি চেয়ার টেনে বসলাম পাশাপাশি। ওয়েটাররা শশব্যস্ত, মুখের কথা খসার আগেই গ্লাসে গ্লাসে জল হাজির। অহনার খাওয়া দেখে মনে হলো খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে বেচারী।

ফুটপাত ধরে হেঁটে অহনার অফিসের উল্টোদিকে এসে দাঁড়ালাম, অহনা অফিসে ঢুকে গেল।রাস্তা পার হওয়ার সময়  মনে হল অহনা ঈষৎ আনমনা। গত বছর একদিন এভাবে অহনাকে রেখে চলে যাওয়ার সময় আমিও এমন আনমনা হয়ে যেতাম। মনে আছে তৃতীয় রাত্তিরে মোহাম্মদ পুরে ঝুঁকে আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলেছিল অহনা, তুমি বুঝনা আমি তোমাকে কতটা চাই!  সেদিন আমার শরীর জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ। চেনাও বটে, অচেনাও বটে। এখনো যখনই অহনা শব্দ ক’টা উচ্চারণ করে, প্রতিবারই যেন নতুন লাগে। আরও গভীর আরও উত্তেজক। সাদামাটা কবিতা কখন যে গদ্য হয়ে যায়?

কতক্ষন কাটল কে জানে। হয়তো কয়েক মিনিট। হয়তো বা অনন্ত কাল। গাড়ীর হর্ণের শব্দে সম্বিৎ ফেরে আমার। ততক্ষণে অহনা হয়তো অফিসের লিফটে।

রাস্তা ঘেঁষে ছয়তলা ফ্ল্যাট বাড়ি। পাঁচিল ঘেরা। দেয়ালে সাদা ফলকে বাড়ির নাম। ক্ষনিকালয়। সূর্য উঠছে। ঢাকার আকাশ আজ পুরোপুরি মেঘে ঢাকা।ফাল্গুন মাস চলছে, এখনো এই শহরে শীতের হালকা আভা। বাতাস বইছে মৃদু মৃদু। তাতে  হিমের ছোঁয়া।

 

ঢাকার ওপর আমার তেমন কোন ও মায়া নেই,বরং এখন একরকম অপছন্দই করি শহরটাকে। কী দিয়েছে আমাকে এই শহর?  শুধু কাঁড়িখানেক অস্বস্তিকর স্মৃতি ছাড়া?  আমার সব তো কেড়ে নিল এই শহর, এই শহরে বাস করা কিছু মানুষ। গত বছর এই সময়টাতেই একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে আমাকে।

আমার ফ্ল্যাট টা দোতলায়। ছোট। তবে মোটামুটি খোলামেলা। ফালি ব্যালকনিতে দাঁড়ালে ওপারে সবুজের হাতছানি। ঘর মাত্র দুখানা। একটু বড় ড্রয়িং স্পেস, মাঝারি ধাঁচের শোবার ঘর।

 

অবশ্য এই ফ্ল্যাট অহনারই পছন্দ বেশী আমার চেয়ে। ও সযতনে রোজ নিজ হাতে সাজায় নিজের সংসার। অফিসের তাড়াহুড়োয় সকালের নাস্তার আমাদের কোন ছিরিছাঁদ নেই। পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। কাছেই একটা নতুন খাবার দোকান হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী মিলে জয়েন্টভেঞ্চার। সকালে নাস্তা পরোটা, ভাজি, হালুয়া সবই বানায়। ঢাকা শহরের এই একটাই প্লাস পয়েন্ট, যেখানেই যাও যখনই চাও টুসকি বাজালেই কোনও না কোন সুখাদ্য জুটবেই। এই শহরে তো লকলকে জিভ আর সর্বগ্রাসী পাকস্থলী ছাড়া কিছু নেই।

অহনা না থাকলে আমার জীবনে কবেই এই শহর থেকে বোকাট্টা হয়ে যেতাম। আসলে আমার জীবনটা এক পাহাড়ি নদীর মতো, মাটি পাথর ভেঙে সে করে নিচ্ছে নিজের রাস্তা। কখনও ছুটছে লাফাতে লাফাতে, কখনও বিপদজনকভাবে আছড়ে পড়ছে, কখনও বা বইছে তিরতির করে।

 

আমি আধশোয়া হয়ে আমার স্মার্ট টিভিতে মুভি দেখছি। রিমোট হাতে কতক্ষণ ঘুরলাম এ চ্যানেল ও চ্যানেল। যতসব হাবিজাবি প্রোগ্রাম। এই সময়টায় আমি অবসর থাকলে বাসায় শুয়ে শুয়ে ফক্সলাইফ দেখি নানা দেশের নানা পদের রান্না দেখায়। আজ দেখাচ্ছে পদ্মের বীজ দিয়ে সামুদ্রিক মাছের একটা পদ। শ্রীলঙ্কার রান্না। মন মতো লাগছে না আমার। আর এই শহরে পদ্মবীজ কোথায় পাব?  পেঁয়াজ নিয়ে রীতিমতো আকাল চলছে যে শহরে সেখানে আবার পদ্মবীজ!

না চ্যানেল না ঘুরিয়ে তাই সোজা ইউটিউবে মুভির আশ্রয়ে চলে এলাম। ইডিটর চয়েস এ চক এন্ড ডাস্টার নামে একটা মুভি রিকোম্যান্ড করেছে। শিক্ষা শিক্ষক নিয়ে মুভি। খানিক অসহিষ্ণু পায়ে আমি পেছনের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। বসন্তের দুপুর গড়াচ্ছে বিকালের দিকে। উঁচু বাড়ির মাথায় সূর্যমুখী হলুদ। পিচরাস্তায় পাতলা বাদামি ছায়া। বাতাসে শিরশিরে ভাব। তেমন একটা উচ্চকিত আওয়াজ নেই কোত্থাও, সব মিলিয়ে আশপাশটা ভারী মনোরম।

দেশে এখন ঘোর দুঃসময় চলছে। সাধারণ মানুষের অধিকার বিপন্ন। এই সময়ে গর্ভনমেন্টের বিরুদ্ধে দ’চার কথা লিখি, দু’চার কথা বলি বলে অনেকেই উদ্বিগ্ন। আসলে মানুষের অধিকার আদায়ের এই বিপন্ন সময়ে সুখী গৃহকোণে মুখ গুঁজে লুকিয়ে থাকার চেয়ে একটু প্রতিবাদী হওয়াই উচিত তা না হলে বেঁচে থাকাই তো বৃথা।

ইদানিং শরীরটা যাচ্ছে তাই রকমের খারাপ হয়ে পড়েছে। এই জ্বর আসছে তো এই ছেড়ে যাচ্ছে। সময় মেনে চেম্বারে যাওয়াও ঠিক ভাবে হয়ে উঠছে না। গতকাল দুপুরের পর জ্বরটা এলো। শরীরটাও কেমন নেতিয়ে গেল। গতকাল সন্ধ্যার আগে অহনা ফোন করলো। চেম্বার থেকে কখন ফিরবো  জিজ্ঞেস করলো। বললাম এইতো চলে এসেছি ।শুক্রবার চেম্বার বন্ধ, মাদারীপুর থেকে আসা একটা রোগীর রিপোর্ট দেখে দিতে হবে বলেই যেতে হলো। ওই প্রান্তে অহনা বললো তাহলে চলো ইতি আপার বাসা থেকে ঘুরে আসি। মন্দ হবে না। আমি বললাম তুমি রেডি হও আমি চলে আসছি।  তারপরই না হয় যাব।

মানুষের উপস্থিতি আর অনুপস্থিতিতে যে কত ফারাক, কত ব্যবধান কিছুদিন আগে মাসুদের বউ মরে যাওয়ার পর মাসুদের বাসায় গিয়ে  মাসুদের সাথে দেখা হওয়ার পর বুঝেছিলাম। নিজ হাতে গোছানো সংসারটা আছে কিন্তু গুছিয়ে রাখা মানুষটাই নেই। এ যে বিশাল শূন্যতা।

ইতি আপুর বাসায় গেলাম রিকশা চেপেই। রিকশা অহনার খুব পছন্দ। অহনার এই বোনটা খুব মায়ার মানুষ। একটা সাক্ষাতেই যে কাউকেই উনি মমতার মায়ায় জড়িয়ে ফেলতে পারেন। এটা একটা বিশাল গুন। সৃষ্টিকর্তা  এই গুন সবাই কে দেন না। আর যাদের দেন তারা বুঝতেই পারেন না এই মায়ার ক্ষমতা।

ইতি আপা উনার এই ক্ষমতার কথা জানে কিনা আমি জানি না। মনে হয় জানে না। অবশ্য সবার সব কথা জানতেও নেই।

আমার মন খারাপ থাকলেই মাঝে মাঝে অহনাকে বলি, চল ইতি আপার বাসায় যাই। আপার বাসায় গেলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়।

সারাদিন পরে আমরা ফিরি আমাদের ক্ষনিকালয়ে। দুনিয়াটাই তো ক্ষনিকের আলয়। একদিন সত্যি সত্যি ছেড়ে যেতে হবে এ ক্ষনিকের আলয় ছেড়ে অনন্ত নক্ষত্রের বীথিতে। তারপর আর ফেরা হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট

Theme Customized BY LatestNews