1. fauzursabit135@gmail.com : S Sabit : S Sabit
  2. sizulislam7@gmail.com : sizul islam : sizul islam
  3. mridha841@gmail.com : Sohel Khan : Sohel Khan
  4. multicare.net@gmail.com : অদেখা বিশ্ব :
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন

ডা. মোজাহিদুল হকের ধারাবাহিক গল্প ২৭

ডা. মোজাহিদুল হক
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০২২
ছবি- ডা. রিপন

জীবনের গল্প

পর্ব – ২৭

চোখ মেলে রাস্তার মানুষ দেখছি। কত মানুষের আনাগোনা। কত রকমের মানুষ। শোকার্ত।বিমর্ষ।খুশি। আত্মমগ্ন। তিন ছোকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ঘাড় নিচু করে দ্রুত পায়ে তাদের টপকে গেল এক তরুণী। সামনের ওভার ব্রীজের সিঁড়িতে বসে আছে এক যুবক একা। ওপাশে গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে লাল নেড়ি কুত্তা। সূর্যের ঝাঁঝ এড়িয়ে। দিন দশেক পর হাসপাতালে এসেছি। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন। গতকাল সারাদিন কেটেছে কেবল খেয়ে আর খাইয়ে। সকালে আবীরের বাসায় আর রাতে আবীররা আমার বাসায়। আবীর,মামুন আমার ন্যাংটোবেলার বন্ধু। এক সঙ্গে তিন জনে পড়াশোনা করেছি, হজমি খেয়েছি, নিষিদ্ধ বই চেখেছি, মৈথুনরত কুকুরদের একসঙ্গে ঢিল ছুঁড়েছি তিনজনে। একসঙ্গে সিগারেট খাওয়া, কলেজ বাঙ্ক মেরে ফয়েজস লেকে আড্ডা। কলেজ শেষে তিনজন তিনদিকে ছিটকে গেলাম। আবীর, মামুন জেনারেল স্ট্রিম আর আমি মেডিকেলে। বহুকাল পরে ডায়রীর পাতা ঘেঁটে ঘুটে মামুনের বাসার নাম্বারে কল দিলাম। এই চোখ বন্ধ করে ঢিল ছোঁড়ার মত। লেগে গেল। কথা হয়ে আমি মামুন দুজনেই উচ্ছ্বসিত। আবীরের নাম্বার মামুনের কাছ থেকে নেয়া। তারপর আবার ছেলেবেলার মত দু’বন্ধু মিলে আবার আমাদের পথ চলা।

বেলা পড়ে এল।একটা নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে গেছে পথেঘাটে। এই আলোতে এখন কোন কিছুই অসুন্দর নেই। মানুষের অসহ্য ভিড় না। যানবাহনের কর্কশ চিৎকার ও না। কদর্য শহরের গায়ে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দিয়েছে শেষ সূর্য। কত স্মৃতি মগজে ভিড় করছে। একবার আমি, মামুন আর আবীরের মনে হল রাতে সমুদ্র দেখতে যাব। যেমন ভাবা তেমন কাজ। অগত্যা বেরিয়ে পড়লাম। রাতে হাঁটতে হাঁটতে ফ্রি পোর্ট থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি, সেই সমুদ্রের পাড়। সেদিন সমুদ্র ভীষণ নির্জন, রুক্ষ। ঢেউ এর কোনও ছিরিছাঁদ নেই, খ্যাপা মোষের পালের মতো শুধু পাড়ে ধেয়ে আসছে। ওই সমুদ্রকে দেখে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল আমার। আবীর বলছিল এই সমুদ্রই ঝড় উঠলে কত ভয়ংকর হয়। সব কিছু আছড়ে চুরমার করে, শয়ে শয়ে জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। আমার কল্প চোখে ভেসে উঠছিল দৃশ্য গুলো। আচ্ছা এই যে বড় বড়  ঢেউ গুলো ভেসে আসছে সেগুলো কি সেসব ডুবে যাওয়া জাহাজের হত্যভাগ্য নাবিকের দীর্ঘশ্বাস?

আবীর জল দেখেই আত্মহারা। পা ছোঁয়াবে বলে দৌড়ে গেল। আমি আর মামুন একদম ঘেঁষিনি ওদিকে। ঢেউ এসে ভাসিয়ে দিল আবীরের প্যান্ট। ছোট্ট একটা হাসির তুফান উঠলো। পৃথিবী তখন সত্যিই মায়াময়। এই মাত্র চাঁদ উঠলো, পাতলা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে গেল দশ দিকে। মিহি আলো মেখে পাথরের চাঁইগুলো চন্দ্রাহত যেন, চাঁই গুলোকে অলৌকিক মনে হচ্ছে। দিনের আলোতে দেখা পাথরের চাঁইগুলো এখন এক অচিন পুরী। মামুন বলে উঠলো- কী দারুণ একটা স্বপ্ন স্বপ্ন পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল দেখ!  আবীর বললো – দেখ আজ তাহলে এখানে এসে ভালোই হয়েছে বল্?

ভাল, কী রে, বল্ মোর দ্যান ভাল। গুড বেটার বেস্ট। সুন্দর একলা বাতাস বইছে। আমরা তিন বন্ধু হাঁটছি। মাথার ওপর এক তারায় ছাওয়া আকাশ, এক কোণে ঝুলছে নৌকোর মতো চাঁদ, নিঝুম নিরালা রাতে হাওয়া বইছে শনশন…..  আহ, বেঁচে থাকাটা কী সুখের?  আমরা গলা ছেড়ে গান গাইছি, ধেই ধেই নাচছি, পাঁই পাঁই ছুটছি, বালিতে গড়াগড়ি দিচ্ছি। ঠান্ডা বাতাস, হাড় কেঁপে যাচ্ছে।

আচমকাই কোত্থেকে একটা অশ্লীল সিটি বেজে উঠল। ঘোর ভেঙে চমকে তাকিয়েছি তিনজনই। পাঁচ সাতজন পুলিশ এসে মুহূর্তে ঘিরে দাঁড়িয়েছে আমাদের। আবীর গজগজ করে উঠল, – কোথ্থাও একটু শান্তিতে বসার জো নেই। পুলিশ অফিসারের জেরা, এতো রাতে এখানে আমরা কি করছি?  বললাম কলেজে পড়ি, রাতের সমুদ্র দেখতে এসেছি। অতি উৎসাহী এক সেপাই বলল, স্যার বড় স্যারের কাছে নিয়ে চলেন। তো আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো বড় স্যারের কাছে। একই প্রশ্ন উনার, আর আমাদের ও একই উত্তর। উনি ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। হ্যা হ্যা করে হেসে উনি বললেন, ফাইজলামি কর?  এ্যাই বেটারা ডবল করো। মামুন কিছু না বলে বলল, আঙ্কেল ডবল কি?  সঙ্গে সঙ্গে বড় স্যারের মুখ চোখ বদলে গেল। অম্নি যে পুলিশ অফিসার আমাদেরকে নিয়ে আসলেন উনি বললেন, দৌড় দাও। আর দেরী করা নয়, উঠেই দৌড়েছি আমরা। দৌড়ে সামনের টং ঘরের আড়ালে লুকিয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণ উনারা নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করল তারপর চলে গেল। আমরা বেরিয়ে এলাম। আবারও তটের দিকে পায়ে পায়ে চলছি আমরা। সিগারেট ধরিয়েছি। তখন কমই খেতাম, দিনে চার পাঁচটার বেশী কখনই নয়। সেদিন কি যে স্বাদ লেগেছিল সে সিগারেটের। আহা।

হিমু সেজে তিনবন্ধু ঘুরে বেরিয়েছি চট্টগ্রাম শহরের অলিতে গলিতে। কত রাত। সারারাত আবীরের বাসায় তিন বন্ধু মিলে আড্ডা দিয়ে, সকাল বেলা ষোলশহর থেকে শাটল ট্রেনে চেপে গান গাইতে গাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসা, রাতে বটতলী থেকে ট্রেনে চেপে অচেনা স্টেশনে নেমে গেছি কতবার!  দুম করে তখনই মামুন প্রেমে পড়লো সাবরিনের। আমরা বুঝে উঠতে পারছিলাম না, এটা কি মামুনের প্রেম?  নাকি প্যাশন?  অথবা নিছকই মোহ?  কারন তখন আমি আর আবীর কারো প্রেমে পড়ার পক্ষপাতি ছিলাম না। তারপর তো মামুন সবাইকে চমকে দিয়ে বিয়েই করে ফেললো সাবরিন কে। আমি চলে গেলাম মুম্বাইয়ে। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের ক্যারিয়ার, পড়াশোনা। বন্ধুদের থেকে হয়ে গেল চুড়ান্ত বিচ্ছেদ।

রবিউলের ফোনের শব্দে স্মৃতির তারটা ছিড়ে গেল। রবিউলের বাসা আমার বাসা থেকে বেশী দূরে না। আমার বাসা থেকে শ, খানেক পা গেলে চার রাস্তার মোড়, বাঁয়ে ঘুরে মিনিট তিনেক হাঁটলেই ডানের গলি, তিনটে বাড়ী পেরুলেই ওর বাসা। আমার বিপদ দিনের ভরসা এই ছোট ভাই তুল্য ছেলেটা আর তার মোটর সাইকেল। এই ঢাকা শহরে যে কয়টা মেয়ে আমাকে পিতৃতুল্য শ্রদ্ধা করে তার মধ্যে রবিউলের বউ মিনি একজন। বয়সে অনেক ছোট। রোগা, বেশ রোগা। উজ্জ্বল গায়ের রং, মুখে একটা আলগা শ্রী আছে। ওর মুখমন্ডলে আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব আছে। রবিউল আমাকে বড় ভাই তুল্য সম্মান করে। মন খারাপ হলে কিংবা গোসসা করলে আমার কাছে এসে ও একরকম স্বস্তি বোধ করে। ঢাকায় রবিউলের বউ মিনিই হলো অহনার একমাত্র ননদ। লক ডাউনের আগেই রবিউল মিনিকে নিয়ে বাড়ী চলে গিয়েছিল। দিন দশেক হলো একা ফিরে এসেছে। রবিউল আমি আর আবীর একসাথে লক ডাউনের ঈদ পালন করবো।

জুতোর শোকেসের উপর সিগারেট প্যাকেট আর লাইটার গড়াগড়ি খাচ্ছে। প্যাকেট টা তুলে নিলাম হাতে। চারটে সিগারেট আছে এখনও। কাল বিকেলে কিনেছিলাম, মাত্র ছটা খরচা হয়েছে। এককালে ভয়ংকর নেশা ছিল ধূমপানের, দিনে দু-তিন প্যাকেট তো উড়েই যেত। অথচ কী আশ্চর্য, অহনা আসার পর এই তীব্র আসক্তিটা আপনা-আপনি কমে গেল।তেমন কোন ও বাহ্যিক কারণ ছাড়াই।  কেন যে কমে গেল?  জগতে কত কিছুরই যে কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া ভার!  প্যাকেট থেকে একখানা সিগারেট বার করে নাড়াচাড়া করছি। এই মুহুর্তে একটা খেতে ইচ্ছে করছে, ধরাব কি?  লাইটার জ্বালাচ্ছি, নেবাচ্ছি। ভাবতে ভাবতে ধরিয়েই ফেললাম। তামাকের আমেজ গ্রহণ করছে মস্তিষ্ক। আবীর আর রবিউল বসেছে মেজেতে পাতা বিছানায়, বোঝাই যাচ্ছে শরীরে জুত পাচ্ছে না। এগারোটার কিছু আগে ওরা সবাই চলে গেল।

ব্যালকনিতে এসে বড় বড় শ্বাস ফেললাম। বিকেল থেকে আকাশটাও ছেয়ে আছে মেঘে। বৃষ্টি নামেনি বটে, তবে খানিকটা যেন শীতল করে দিয়েছে পৃথিবীকে। হাওয়ায় সামনের মেহগনি গাছের পাতা গুলো ঝিরিঝিরি কাঁপছে। উঠে ঘর থেকে সিগারেট -লাইটার নিয়ে এলাম। ধরাতে ইচ্ছে করল না, ফাঁকা চোখে তাকিয়ে আছি মেহগনি গাছটার দিকে।খাটের কোনায় হাঁটু মুড়ে বসল অহনা। থুতনি রেখেছে হাঁটুতে। ভাবছে কী যেন। দৃষ্টি মোবাইলের স্ক্রিনে। ওয়ালটা ঘেঁটে ঘুটে দেখছে। একটা গাঢ় নৈঃশব্দ্য ছেয়ে আছে ঘরে। পায়ের দিকে জানালার একটা পাট খোলা, গ্রিল টপকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে অন্ধকার। কি ভাবছে অহনা? ঈদ মানেই হইচই, আনন্দ, ভিড়, কোলাহল। ঈদ মানে উৎসব। মিলনের। আবেগের। উচ্ছাসের। ঈদ মানে হঠাৎ আসা প্রাণের জোর। ঈদ মানেই দিল হুম হুম করে…..  আহারে এবার তো কোনটাই হলো না। সে জন্য বুঝি মন ভার?  কুসুমের কাছে যাওয়া হয়নি বলে?  কুসুম একফালি হাসি উপহার দিলেই খুশীতে অহনার চোখের পাতা উল্টে যায়। সে কুসুম কে খুব বেশী মিস করছে বুঝি অহনা?

পুরো বাংলাদেশের ছবিটাই হয়তো এখন এমন, অনেকেরই হয়তো অহনার মতো প্রিয়জনের কাছে যেতে না পারায় মন ভার। কিংবা আনন্দের নয়। এই তো সেদিন মিরপুর রোডের দিকে গিয়ে দেখি ছোট বড় বন্ধ কারখানা গুলোর সামনে ম্লান মুখে বসে আছেন বেশ কিছু মানুষ। দেশের বহু কল কারখানাই বন্ধ। কত মানুষ যে বেকার। এঁদের ঈদের কেনাকাটা নেই এবার। নেই সেই মানুষগুলোর ও, ঈদের আগে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে যাঁদের ঘরবাড়ি ভেসে গেল। এঁদের কথা ভেবে উৎসবের আনন্দ কি এক মুহুর্তের জন্যও থমকে যায় না?  যায় বৈকি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট

Theme Customized BY LatestNews