1. fauzursabit135@gmail.com : S Sabit : S Sabit
  2. sizulislam7@gmail.com : sizul islam : sizul islam
  3. mridha841@gmail.com : Sohel Khan : Sohel Khan
  4. multicare.net@gmail.com : অদেখা বিশ্ব :
মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ০৯:০৮ অপরাহ্ন

কথা সাহিত্যিক শামসুন নাহারের গল্প ’ক্ষমা প্রার্থণা’

সাহিত্য ডেস্ক
  • প্রকাশিত: রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২
কথা সাহিত্যিক শামসুন নাহার।

ক্ষমা প্রার্থণা

-শামসুন নাহার

পরী ও জরী ছোটবেলার বন্ধু। একসাথে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়েছে।পরী এখন কলেজে পড়ায় আর জরী বিয়ে করে সংসারী।আজ অনেক দিন পর জরী পরীর কলেজের কোয়ার্টারে হাজির।
পরী খুব অবাক জরীকে দেখে এতোদিন পর। দরজা খুলে জরীকে দেখে বললো তুই এতোদিন পর? আমার ঠিকানা কোথায় পেলি?
জরীঃ ঘরে ঢুকতে বলবি না?
পরীঃ আচ্ছা ভেতরে আয়।
জরীঃ তোর ফুফুর থেকে আমি নিলাম তোর ঠিকানা। মন্টুর ট্রেনিং এ শহরে, আমি বললাম তোর সাথে দেখা করবো। তাই আমিও সাথে এলাম। বসত বলবি না।
পরীঃ বসলে যদি তোর ভাল লাগে তুই বস, আমার জন্য এখন তুই মন্টু কেউই কোন মেটার করিস না। আমি তোদের জীবন খাতার পেছনের পাতায় রেখে সামনে এগিয়ে এসেছি, তাই তোর আগমন অবাক করেছে বৈ কি? কেন এলি এত দিন পর, কি চাস তুই?
জরীঃ আমারে মাফ কইরা দিস পরী, রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন মাগফেরাতের মাস।
পরীঃ কি করছোস তুই আমার লগে যে মাফ চাওয়া লাগবো?
জরীঃ মন্টু মিয়ার লগে তোর বিয়া ঠিক অওনের ফর আমি তারে আর তার মারে ফটো এডিট কইরা তোর কিছু বাজে ছবি বানাইয়া ফাডাই, তোর বিয়া ভাইঙ্গা যায়। তোরে লইয়া গেরামে সালিশ বয়, তোর পরিবারের তোরা তিনজন – চাচা, খালা আর তুই তোরারে এক ঘরে করে গেরামের চেয়ারম্যান আর মসজিদের হুজুর। হুজুর চাইছিল দোররা মারতে তোরে কিন্তু চাচার সম্মানের দিকে চাইয়া এক ঘরে করে তোরারে। হেই রাইতেই চাচা ফাঁস লয়। উনার আত্মহত্যার পর তোরা বাড়ী ও জমি বিক্রি কইরা তোর ফুফুর বাড়ীত আশ্রয় লস। তারপর মন্টু মিয়া আমারে বিয়া করে, কিন্তু তোর অপমানে ও অসম্মানে বিয়া ভাঙ্গার কষ্টে চাচার পরে খালাও মারা যায়। তুই এতিম হইয়া যাস।আমি সব কিছুর পর আর আমার ভুল বুঝতে পারি কিন্তু তোরে কওনের সাহস পাই নাই, ঘর ভা্ঙ্গার ভয়ে মন্টু মিয়ারেও কইতে পারি না, আমারে মাফ কর তুই এই পাপের বোঝা আমি আর বইতাম ফারি না।বলেই সে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়।
পরীঃ যা হবার হয়েছে, আমি ভাল আছি, তুই ভালো থাক তবে আমার সামনে আর আসিস না, মাফ করলাম, তোর চেহারা আর দেখতে চাই না।
জরীঃ এই তোর শেষ কতা?
পরীঃ হ এইডাই শেষ কতা।
জরীঃ দেখ আমার মন ডা শান্তি লাগে না, একটা কষ্ট কলিজায় চাপ দিয়া বইয়া থাকে, দম বন্ধ হইয়া আসে আমার, আমারে মাফ কর, তুই না মাফ করলে আল্লাহ আমারে মাফ করবো না।
পরীঃ বাহ্ চমৎকার! আমার বিচার পুরো গ্রাম মিলে করলো তোর বাবা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিল বলে, আমি গ্রাম্যসালিশ থেকে বাঁচতে পারলাম না আমার পরিবার বাঁচলো না আমার বাবা সহজ সরল শিক্ষক ছিল বলে। যাকে ভালোবাসলাম সে পাশে দাঁড়ালো না আমি দুশ্চরিত্র বলে। আমি বাবা হারালাম, মা হারালাম, দুশ্চরিত্রের বোঝা মাথায় নিয়ে গ্রাম ছাড়লাম। হা হা আর আজ যে আমাকে দুশ্চিরত্র বানিয়ে গ্রাম ছাড়া করলো সে সবার অগোচরে আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে? এ কেমন বিচার?
তুই মন্টুকে পছন্দ করিস বলিসনি তো কখনও? জরী তুই একবার বলতি মন্টু মিয়ারে বিয়া করবি, আমি নিজে তোদের বিয়ে করিয়ে দিতাম।প্লিজ চলে যা, আমি আর নিতে পারছি না।এর চেয়ে আমি জানতাম না কে আমার এত বড় সর্বনাশ করেছিল সেই ভাল ছিল। প্লিজ চলে যা, আমি আর কোনদিন তোর চেহারা দেখতে চাই না।
জরী আর কি বলবে ভেবে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘর হতে বের হতে যাবে এমন সময় দেখে মন্টু মিয়া দাঁড়িয়ে দরজায়, জরী বলে আমাকে মাফ করো আমি ভুল করে ফেলেছি।
মন্টু মিয়াঃ ভুল, এ কেমন ভুল, আমি অনেক আগে থেকে জানি তোমার এ ভুল তবে আমার মা তোমাকে ভীষন ভালবাসেন তাই আমি আর পরিবারে অশান্তি করিনি তবে ঘৃণায় তোমার কাছেও যাই না। অপেক্ষায় ছিলাম কবে তুমি সত্য বলো? অপরাধী আমি ও কম নই। সত্য মিথ্যা যাচাই না করে
আমরা সবাই সেদিন গুণাহ করেছিলাম। পরী আমাকেও পারো যদি ক্ষমা করো।
পরীঃ মন্টু প্লিজ তুমি ওকে নিয়ে এখান থেকে যাও। তোমরা দুজন জীবনে আর আমার সামনে আসবে না। আমি মাফ করলাম। তবে এতো শক্তি নেই আমার তোমাদের চেহারা দেখার,
যাও দয়া করে- আর কখনও আমার সামনে আসবে না।
মন্টু মিয়াঃ ঠিক আছে আসবো না, তবে আমি সেই ফটো এডিটরকে খুঁজে বের করেছি, ওর স্বাক্ষী মোবাইলে রেকর্ড করেছি, তুমি যদি একবার গ্রামে আসো সামনের শুক্রবার আমি জনসম্মুক্ষে ঘটে যাওয়া ঘটনার সত্যতা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই, তোমার মা বাবাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না তবে তোমাদের সম্মান ও সম্পত্তি আমি ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্হা করতে চাই। গ্রামের চেয়ারম্যান, জরীর বাবা মেম্বার, ইমাম সাহেব সবাই নিজেদের করা অপরাধে লজ্জিত। তুমি কি শাস্তি দিতে চাও এখন তুমি নির্ধারণ করো।
পরী অনেক চেয়েও আর নিজের দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারে না, তার ভেতর থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চায়। তবে সে ঐ লজ্জিত মুখগুলো দেখতে চায়। সে বলেঃ ঠিক আছে, তুমি বিচারের ব্যবস্হা করো সামনের শুক্রবার, আমি আসবো।তোমরা যাও এখন।
জরী আর মন্টু মিয়া বাড়ী ফিরে সালিশের আয়োজন করে, পরী আসে সে সালিশে। চেয়ারম্যান, মেম্বার ও ইমাম সাহেব তার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চায়- মা আমরা তোর গোণাহগার, আমরারে মাফ কর।
পরীঃ আমার বাবারে ফিরায়া দেন, আমারে করা অপমান আর বাবা মার কষ্ট ফিরায়া নেন, পারবেন দিতে পারবেন না তাহলে আমি কেমনে মাফ করি আপনাদের? আপনাদের কোলে আপনাদের চোখের সামনে বড় হইছি কেমনে ভাবলেন আমি এতো খারাপ? কেমনে ভাবলেন চাচা? কাঁদতে কাঁদতে বললো পরী। একটু যাচাই করলেন না আফনেরা?
চেয়ারম্যান বললেন ঐ স্টুডিওর ক্যামেরাম্যান আর জরীরে পুলিশের হাতে তুলে দেই তুমি যদি চাও মা।
পরীঃ না আমি আর বিচার চাই না, আমি সবাইরে নিয়া একটা ভালো কাজ করতে চাই।আমি কইতে চাই, আমার বাড়ীটা ও জমিগুলো যা আপনারা নামমাত্র দামে কিনছিলেন, সেই টাকা ফেরত দিয়া
আমি সেখানে শহীদ বুদ্ধিজীবী “ডাঃ ফজলে রাব্বীর” নামে একটা বিজ্ঞান ও ফলিত কলা কলেজ খুলতে চাই, পাশে একটা পাঠাগার থাকবো- আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানের বই আইনা মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াবো। জরীর শাস্তি হইলো এইডা সে দেখাশুনা করবো। আপনারা চাইলে সহযোগিতা করতে পারেন।
ইমাম সাহেবঃ কি কও মা এর চেয়ে উত্তম প্রস্তাব আর কিছু নাই, লাগলে তুমি আমার জমিও লও।
মেম্বার সাহেবঃ মাগো আমিও টাকা পয়সা দিয়া সাহায্য করবো।
মন্টু মিয়াঃ আমি জরীর সাথে থেকে সাহায্য করবো।
পরী ঠিক আছে, আমি আজ যাই, পরিকল্পনা তৈরী করি, অনেক কাজ এখন। সামনের সপ্তাহে আবার আসবো।আসি তাহলে?
চেয়ারম্যানঃ মা তোর বাবা নাই তো কি হইছে আমরা আছি না, সাজুও লন্ডন থাইকা FCPS পাশ কইরা আইছে, গেরামে থাকতে চায়, হাসপাতাল বানাইতে চায়।
পরীঃ তাই নাকি কবে এলো সাজু ভাই?
চেয়ারম্যানঃ মাস ছয়েক আগে আসছে।ঐতো সাজু। এই সাজু দাঁড়া বাজান।
পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ডাক্তার সাজেদুর রহমান, চেয়ারম্যান
ছিদ্দিকুর রহমানের ছেলে।দাঁড়ায় সাজু।
চেয়ারম্যানঃ আরে এইখানে আয় সাজু দেখ পরী আসছে, আমরারে ক্ষমা করছে, তোর কথায় আমি ভরা সালিশে ওর কাছে ক্ষমা চাইছি।
সাজুঃ বাবা তোমরা গোণাহ করেছ, তোমাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন ছিল। কেমন আছ পরী? গ্রামে এসেই তোমার সাথে ঘটে যাওয়া দুর্বিষহ ঘটনার কথা জানতে পারি। তুমি একটা গ্লানি থেকে এ গ্রামকে মুক্তি দিলে।
পরীঃ পুরনো কথা আর ভাবতে চাই না। এ গ্রামে জন্মেছি, শেঁকড় আমার এখানে।
সাজু, পরী ও চেয়ারম্যান হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিল। সাজু বললোঃ চলো আমাদের বাড়ী, আজ ইফতার করো আমাদের সাথে, অনেক কিছু বলার আছে তোমাকে।
পরী বললো আজ একটু তাড়া আছে আমি আসবো আবার সাজু ভাই। সামনের সপ্তাহে খাবো তোমাদের বাড়ীতে চাচীকে বলো।
চেয়ারম্যানঃ দাঁড়া মা, তোর চাচী চায়
তুই আমরার মাইয়া হইয়া থাক, সাজুও তাই চায়।
পরীঃ চাচা আমি এমন কিছু ভাবিনি, আপনারা প্রস্তাব দিলেন, ফুফু কি তবে সেদিন এই সাজু ভাইয়ের কথা বলছিলো? আমি ভেবে ফুফুকে জানাবো।
এই বলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে পরী বাসে উঠে শহরে ফেরার জন্যে। তার মনে হয়, জীবন কত পরিবর্তনশীল – আজ এটা তো কাল সেটা- তবুও আল্লাহর রহমত সে বেঁচে থাকতে থাকতে
তার উপর লাগানো কলঙ্ক ধুয়ে মুছে দিলো আল্লাহ।সাজু ভাই সম্বন্ধে সে কখনও ভাবেনি তারপরও তার জীবনে আল্লাহ যদি নতুন করে সব সাজাতে চায়- সে কেনো দরজা বন্ধ করে রাখবে?
দেখা যাক, ফুফু আছেন তিনি যা ভালো মনে করেন করবেন।
পরী স্বপ্ন দেখে তার কলেজটি তৈরী হয়ে গেছে, এখানে ছাত্রছাত্রীরা বর্তমান বিশ্বের সাথে টিকতে পারে এমন কিছু বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পরছে, একসময় কলেজটি বিশ্বের প্রথম ১০০টি কলেজের তালিকায় স্হান পায়। স্বপ্নে পরীর মনে বাজলো ভূপেন হাজারিকার গান-
আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয়
হাসি নিয়ে আয় আর বাঁশি নিয়ে আয়,
মরণ ভুলে যাবি ছুটে ছুটে আয়…….

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট

Theme Customized BY LatestNews