1. fauzursabit135@gmail.com : S Sabit : S Sabit
  2. sizulislam7@gmail.com : sizul islam : sizul islam
  3. mridha841@gmail.com : Sohel Khan : Sohel Khan
  4. multicare.net@gmail.com : অদেখা বিশ্ব :
শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ন

ডা. মোজাহিদুল হকের ধারাবাহিক গল্প ৫২

সাহিত্য ডেস্ক
  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০২২

জীবনের গল্প

-ডা. মোজাহিদুল হক

পর্ব-৫২

সমুদ্রে নিম্নচাপের তৈরী হয়েছে ।আকাশের বৃষ্টি যেন এই বাড়ীটার ওপরেই বর্ষণ করছে । হাওয়ায় হাওয়ায় ঠোকাঠুকি হচ্ছে । বারান্দার ওপর বাদলা সকালের ফ্যাকাশে আলো পড়ছে । অহনা তখনও বিছানায় শুয়ে আছে । ঠান্ডা পড়ছে ডিসেম্বর মাস তার উপর বৃষ্টি । চাদরটা গলা পর্যন্ত টেনে নিয়ে ঘুমাচ্ছে কি শান্ত ভাবে ! আশে পাশের বাড়ীর ফাঁক ফোকরে দৈত্যের মতো অন্ধকার জমে আছে । অন্ধকার জমে আছে আমাদের পুরো ফ্ল্যাট জুড়েই । বারান্দায় অহনার লাগানো মাধবী লতায় কয়েকটা পাখি এসে কিচির মিচির করে আজকাল । হু হু করে হাওয়া বইছে । এমন বৃষ্টি হলেই গ্রামের বাড়ীর কথা খুব মনে পড়ে । এরকম বৃষ্টি হলে বাড়ীর সামনের পুকুরের কাক চক্ষুর মতো জলে বৃষ্টির ফোটা ঝরে পড়ার দৃশ্য কি যে ভালো লাগত ! মনে পড়ে ছোট বেলায় অনেক বৃষ্টি হলে পুকুর ভেসে যেত , টলে টলে পানি পুকুরের উত্তর পাড় ঘেঁষে , ঘন ঝোপ আর জঙ্গলের পাশ দিয়ে বাজারের বড় রাস্তা পেরিয়ে খালে গিয়ে পড়ত । নির্জন , ভেঙে পড়া মাদ্রাসার পেছনে ঝোপ জঙ্গলের দিকে তাকালে কেমন ভয় ভয় করতো । নিচে জমিতে জাল নিয়ে নেমে পড়তো ও পাড়ার ছেলেরা । বৃষ্টি কমে গেলে ও বাঁশঝাড় থেকে অনবরত টপটপ করে জল ঝরে কি যে মায়াবী এক দৃশ্যের সৃষ্টি করত ? রাতে ঝোড়ো বাতাসে বাঁশে বাঁশে ঘষা লেগে কেমন এক অদ্ভুদ শব্দ তৈরী হতো , শৈশবের আমার মত ভাবত দৈত্যরা বুঝি বেরিয়ে পড়েছে । এক্ষুনি হয়তো বলবে হাউ মাউ খাউ , মানুষের গন্ধ পাও । কাঁথা দিয়ে মাথা ঢেকে আমি আর সেজ ভাই তখন ভয় নিয়েই ঘুমিয়ে পড়তাম । উঠানের জমা জলে রোদ পড়ে চিক চিক করত , আমার সেসব দেখতে খুব ভালো লাগত । পেছনের জমিতে জল জমত ,সে জলে ব্যাঙেদের গ্যাংগর গ্যাং শুনতে শুনতে হারিয়ে যেতাম অচেনা এক অচিন পুরে । আহারে গ্রাম !আহারে ছোট বেলা !

ঠান্ডা নামছে হিম , চাঁদ ফুটে আছে শহরের বড় গাছ গুলোর মাথায় । পাশের বাড়ীর ছাদে অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় আবার একবার পিঠ দেখায় । পশ্চিম থেকে একটা হিমেল বাতাসের ঝাপটা এলো । বারান্দায় পাক খাচ্ছে সে বাতাস । শির শির করছে । বাইরে নিউমোনিয়া রোগীর শ্লেষ্মার মতো জমে বসেছে কুয়াশা । চারপাশের পৃথিবীটা স্তব্দ । শুকনো পাতার ওপর শিশির পড়ার শব্দ টপ টপ । প্রায় সারারাতই পাশের রাস্তা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে বাস – ট্রাক যায় । ঢাকায় এই কয়দিন শীতই নামেনি গত ক’দিন পড়তে শুরু করেছে । আবীর আর আমি হুট করে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই কুষ্টিয়া থেকে বেড়িয়ে এলাম । আলো ফোটার আগেই ঢাকা ছেড়ে বেরিয়েছি । মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক কাক উড়ে গেল । হেমায়েত পুর পার হতেই শীত কুয়াশা দু’টোরই দেখা মিলল । আবীর খেয়ালি করে শীতের কাপড় নেয় নি । সাটুরিয়া পৌছেছি টের পাচ্ছি আবীর শীতে হি হি করে কাঁপছে । পদ্মা পেরিয়ে রাজবাড়ী ঢুকেছি অম্নি কি এক নৈসর্গিক দৃশ্য । মাঠের ধান কাটা হচ্ছে । কয়েকটা জমিতে আঁটি বাঁধা ধান পড়ে আছে । দুর থেকে হালকা কুয়াশায় যুদ্ধক্ষেত্রে অগনিত মৃত সৈনিকের মতো লাগছে আঁটি গুলো । থেমে দাঁড়ালাম । শিশিরে ধুয়ে ধুয়ে ধানের শিষগুলো চকচকে সোনার মতে লাগছে । রাস্তার ধারের ডোবায় কচুরিপানার ফুল ফুটে আছে । সেখানে এক ঠ্যাঙের ওপর ভর দাঁড়িয়ে কয়েকটা বক । তার পাশে কাদাখোঁচা , লম্বা ঠোঁট খচখচ করে ক্ষতবিক্ষত করছে কাঁচা কাদা । বহুদিন পর কাদোখোঁচা দেখলাম । বড় রাস্তা ধরে আমাদের পাশ কাটিয়ে হুস হুস করে পার হয়ে যাচ্ছে গাড়ী । ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা আসছে ,তাতে নিকোটিনের ইচ্ছা বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুন ।

রান্না ঘরে এল অহনা । ষোলো সতের দুইদিন ছুটি । শহরের লোক সব দল বেঁধে ছুটছে গাঁয়ের পানে । আর যাদের টাকার ছড়াছড়ি তারা যাচ্ছে ট্যুরিস্ট স্পটে কক্সবাজার নয়তো হিলে । অহনা লম্বাটে কফি মগখানা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসেছে সোফায় । একটু যেন চটে আছে । চটবেই না বা কেন ? কোথাও ঘুরতে যাবার ফুরসত করতে পারি না । আঠারো তারিখ ছুটি নিতে পারলে কোথাও যাওয়া যেত । ছুটি নিতে পারবে ? ছুটি নিয়ে কী হবে ? অহনার স্বরে মৃদু অভিমান । বাইরে এখনো বিকেল । রোদ নেই , নিউমোনিয়া রোগীর শ্লেষ্মার মতো কুয়াশায় চারদিক আবছা । অহনা টিউব লাইট জ্বেলে পর্দা টেনে দিল । চেম্বারে যাবার পথে ভাবছি অহনা কে একটু চমকে দেব । কয়েকদিন আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে , মেজো মা’র হাতের আলু ঘাঁটা  আর গরুর মাংস খেতে নাকি জান হাঁসফাঁস করছে । এসব খেতে মানুষের জান হাঁসফাঁস করে জানতাম না । ওকে দুদিনের জন্য বরং কুষ্টিয়াই নিয়ে যাই । মেজো মা’র হাতের আলু ঘাঁটা আর গরুর মাংশ বরং খাইয়ে নিয়ে আসি । সক্কাল সক্কাল অফিসে বেরিয়ে গেল অহনা । আব্বার কথা খুব মনে পড়ছে । সতেরো তারিখ আব্বার মৃত্যু দিবস । আব্বার কথা মনে হলেই বুকটা ভারী হয়ে আসে । কী চমৎকার গল্প বলত আব্বা , কথনের জাদুতে বিস্তার করতো সম্মোহন । ছোট বেলায় আব্বা যখন ইংরেজী বই পড়ে শোনাত , আনমনা হবার জো ছিল না । মারা যাবার আগে মুম্বাই থেকে আসার পর আমাকে বলত রিটায়ারমেন্টের পর সারাদিন পড়োশোনা আর লেখালেখি করব । চাকুরী জীবনের কথা ,সমাজের অসংগতির কথা , তোর আম্মাকে নিয়ে ইচ্ছে মতন ঘুরে বেড়াব । রাজনীতি করব , ইলেকশান করব ……। কিন্তু কিছুই পারলেন না । দুপুরে অহনা খেতে এল । সোফায় পাশে বসিয়ে ওর হাত ধরে আছি ও বুঝতেই পারল না আব্বার জন্য আমার মন খুব খারাপ করছে । আব্বার কথা মনে করে রোজ আমার চোখের কোল চিকচিক করে , কেউ দেখে না ।

মেসেঞ্জারেই অহনাকে মেসেজ পাঠালাম , চল কুষ্টিয়া যাই । আঠারো তারিখ ছুটি নাও । অহনা বলল ছুটি নিতে হবে না , চাকরি করা মেয়েদের একটু কায়দা করে ছুটি নিতে হয় । বললাম একটু আগে বেরুতে পারবে ? – কেন ? চল ,আমার সাথে চেম্বারে তারপর ওখান থেকে গাড়ীতে তেল নিয়ে বাসায় ফিরব । তাহলে তুমি পাঁচটায় অফিসের সামনে চলে এসো । না , তুমিই বরং তোমার আগের মেস বাড়ীটার সামনে থেকো আমি তোমাকে তুলে নেব । অহনাকে বললাম তোমার বাড়ীতে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই । হুট করে গিয়ে চমকে দেব সবাই কে । অহনা মাথা নাড়ল বটে তবে আমি জানি ও তার মা’কে কল না করে থাকতেই পারবে না ।

বাইরে এখনো অন্ধকার । কুয়াশার মিহি একটা চাদর চরাচরে । রাস্তায় একটা লোক ও নেই । শ্যামলীর মূল রাস্তায় ওঠেছি অম্নি সব রাস্তা বন্ধ সমস্ত ইউটার্ন বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ । প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধে যাবেন । শেষে ঘুরে আসাদ গেট হয়ে , বসিলা রোড দিয়ে বেঁড়ি বাঁধের ওপর দিয়ে গাবতলীর দিকে রওয়ানা হলাম । লম্বা গাড়ীর লাইন , সারি সারি গাড়ী দাঁড়িয়ে । টেনেটুনে লাইনের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখি সামনে পুলিশের ব্যারিকেড । পাক্কা দুই ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পার হলো । লোকজন খিস্তি করছে । সরকারি টাকার এতো শ্রাদ্ধ্য হচ্ছে আর প্রধান মন্ত্রীর জন্য একটা হেলিকপ্টার কেনা যাচ্ছে না ? দু’তিন ঘন্টা শুধু উনার চলাচলের জন্যে পাবলিকের নষ্ট হলে তার জবাব কে দেবে ?? ঘোড়ার মাথা । শুধু বসে বসে বাকত্যালা হজম করা যায় ? কনকনে ঠান্ডায় এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় ! অহনা অস্থির হচ্ছে । কিছু না বলে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল শুধু । এতক্ষনে ফেরীতে থাকার কথা । ভাগ্যদেবীর ঠাট্রা ছাড়া আর কী ! কত কিছুই তো কল্পনা করে মানুষ , সব কি আর ঘটে সেই মতো ?  ভাবলাম রাজবাড়ী গিয়ে সকালের নাস্তা করব , কখন যে কোত্থেকে এক উটকো ঝামেলা এসে ভেস্তে দেয় সাজানো ছক । হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম ।

ফেরীতে যখন উঠেছি তখন ঝকঝকে রোদ ,তবে তাপহীন । ছানা কাটার মতো আকাশে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে । নতুন বেনারসীর মতো ঝলমল করছে চারধার । ফেরীতে নানা রকম গাড়ী , নানা অচেনা লোক তাদের ছেলে মেয়ে বৌ । আমি নিস্পৃহ চোখে চেয়ে দেখি । পাড়ে ভিড়ল ফেরী । স্টার্ট দিতেই মেঘের মতো গুর গুর করে ডেকে ওঠে আমার ভিকরান্ত মোটর সাইকেল । পোড়া পেট্রোলের গন্ধ আসে নাকে । বড় রাস্তায় উঠি । ক্রমে গাড়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকে রাস্তায় । গোয়ালন্দ বাজার ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি , পথটি বড় একা লাগে । হাতের বামে একটা পোড়া ভিটে । ভাঙা , শ্যাওলা- ধরা ইটের পাঁজা স্তুপ হয়ে আছে । আগাছায় ডুবে যাচ্ছে আস্তে আস্তে । জায়গায় জায়গায় পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষ । কয়েকটা দেয়ালের অস্তিত্ব তবে মাথায় সবুজ মুকুট – মৃত্যুর । মানুষ গাছ কাটে বসত গড়ে , মানুষ মরে গেলে জনহীন বাড়ী আবার দখল করে গাছেরা , প্রকৃতির প্রতিশোধ কি ? হয়তো । ভর দুপুরে সেখানে ঝিঁঝিঁ ডাকছে । হঠাৎ আমার মনে হয় প্রাচীন কোন রাস্তায় পঙ্খীরাজে ভেসে বেড়াচ্ছি আমি আর অহনা । কয়েকদিন বৃষ্টি হয়ে গেল শীতকালে । তারপর ঝাঁকিয়ে শীত পড়ছে । চাষীর পেঁয়াজ চাষের সর্বনাশ হলো । কালুখালি পার হচ্ছি আর পেঁয়াজের পঁচা গন্ধ নাকে লাগছে । কুয়াশা সরে গিয়ে নীলাভ মেঘের মতো দুরের গ্রাম দেখা যাচ্ছে । মাঝে চা খেতে একজায়গায় দাঁড়ালাম । খৈয়ের মোয়া হাতে ছোট্র একটা বাচ্ছা দাঁড়িয়ে আছে দুরে । ছোট বেলায় আমরা ও খুব মোয়া খেতাম আম্মা বানিয়ে দিত । আহা !এমন শীতে ধোঁয়া ওঠা ভাতে ঘি মাখিয়ে উঠানে বসে খেতাম । কতদিন ক্ষীর আর সবরিকলা দিয়ে মেখে মুড়ি খাওয়া হয়নি । রাস্তার পাশের বাড়ীর উঠানে রোদে দেওয়া কলাই খুঁটে খাচ্ছে শালিখ । লুকিং মিররে অহনার ঢুলু ঢুলু চোখ । আমি আবার মোটর সাইকেল সাইডে দাঁড় করাই । চা খাই । গড়াই নদীতে সাদা পাল তুলে মন্থর নৌকা যাচ্ছে কোন স্বপ্নের দেশে । গড়াই ব্রীজ পার হয়ে কুষ্টিয়া । আমরা এগিয়ে চলি , দুপুরের নিঃঝুম আলোছায়ায় । মায়াবী আলোয় এক অচেনা দেশের  পথঘাট পার হয়ে কিছু প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে আসি ।

মেজো মা’দের বাড়ীর পেছনের দিকটা যেখানে দাদা দাদুর কবর সে জায়গাটা বড় নির্জন । ঠিক কবরের ভেতরের মত । ঘন অরণ্যের গন্ধ , পাখির ডাক , তার নীচে কুল কুল করে বয়ে চলা হিশনা  । সেখানে গেলে খুব একা লাগে । অহনার মেজো আব্বা বড় ভালো মানুষ । শ্যামলা মানুষটার শরীরের রংয়ে কি একটা দ্যুতি আছে । সেই রঙে রোদ পড়লে আলো দেয় । সন্ধ্যার সময় বড় সুন্দর ভঙ্গিতে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখেন । ছেলে ,ছেলের বউ , নাতী- নাতনিদের নিয়ে গল্প করেন । মাঝে হার্টের সমস্যার কারনে শরীরখানি একটু ভেঙে গেছে । এবার যাওয়ার পর দেখি পুরনো ফুল হাতা সোয়েটার তার ওপর শাল জড়িয়ে বারান্দায় বসে আছেন । আমাদের দেখে সে কী সৌম্য হাসি । দেখেই প্রাণ জুড়িয়ে যায় । বারান্দায় বসে গাছগাছালির দিকে চেয়ে চুপ করে বসে থাকেন । তাঁর চোখে মুখে অপার মায়া ঝরে পড়ে । ভূমি , অর্থ এবং সন্তান এই তিন নিয়ে পুরুষের অধিকার বোধ আর প্রায় এইতিনই তার যথেষ্ট আছে । সুখবোধ মিশ্রিত নানা দুঃখ হয়তো তার আছে তবে সেগুলো তাকে হয়তো তেমন একটা ছোঁয় না । তাঁর দীর্ঘ শরীর অনেক রোগা হয়ে গেছে । অহনার খাবার সব আব্দার মেজো মা’র কাছে । ডালের বড়ি খাবে তো মেজ মা , পিঠে পুলি খাবে তো মেজ মা ,যাই ই পরাণে খুঁজুক মেজো মা কে বলতেই হবে । আর মেজো মা ও দশভূজার মতো সে সব জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । এবার ছয় বেলার তিন বেলাই কাটলো মেজ মায়ের ঘরে । আলু ঘাটা , গরুর মাংস , ক্ষেতের চালের ভাত , কলাই ডাল সব খাওয়ালো । বললাম , মেজো মা জ্বালাতে এসেছি এবার । মেজো মা বলে , সে কী কথা ছেলে পুলে মা কে জ্বালাবে না তো কাকে জ্বালাবে ? যেদিন চলে আসবো তার আগের দিন রাতে মরিচের ভর্তা চিতোই পিঠা চুলো থেকে নামিয়ে কি যত্ন করে খাওয়াচ্ছেন আর আমি ধোঁয়া ওঠা সে পিঠা ভর্তা মেখে সমানে খেয়ে যাচ্ছি । সাথে রুবেল ভাইয়ের বউ , ভাবীকে দেখলে মনে হয় এই মানুষটাকে সৃষ্টিকর্তা বোধ করি মেজো মায়ের সংসারের বউ করবেন বলেই বানিয়েছেন । আচমকা কেউ এলে ভুলে মনে করতে পারে এ বুঝি এ বাড়িরই মেয়ে । অবশ্য এ কৃতিত্ব মেজো মায়েরই । অন্য বাগানের গাছ যেমন আরেক বাগানে পুঁতলে যত্ন আত্তি করে তাকে সে বাগানে সহনীয় করে নিতে হয় , তেমনি অন্যের বাড়ীর মেয়েকেও নতুন সংসারে সহনীয় করার দায়িত্ব টা শ্বাশুড়ীরই । আর সেটা পরিপূর্ণ করেছেন মেজো মা । তা করেছেন বলেই পেয়েছেন নির্ঘাত লক্ষ্মী ।

তখন ভোরবেলা । গাড়ী চলছে গভীর গাছপালার সবুজের ভেতর দিয়ে । পাখ – পাখালির ডাক । কুয়াশার আবছায়ায় সরু একটা খালের পাশ দিয়ে ছুটছি । কী শীত! কী নির্জনতা । কী যে মায়া পৃথিবীর , সবুজের কী বৈরাগ্যের রঙ লেগে আছে দুরের বিস্তারে । কোথাও পৌছাতে ইচ্ছে করেনা । চলুক এই মোটর সাইকেল টা অনন্ত যাত্রায় । এই ভোর বেলাটি স্থির থাকুক তার কুয়াশার আবছায়া নিয়ে । সামনে কোথাও ঢাকা বলে কোন জায়গা নেই যেমন নেই পেছনের কুষ্টিয়া । এবার ছোট গিন্নী অনেক বাধা পেরিয়ে আমাদের সাথে যাচ্ছে ঢাকায় । পথে যেখানেই থামছি , চেয়ে দেখছি ছোট গিন্নীর চোখে দুনিয়ার কৌতুহল । গোয়ালন্দ ঘাটের আগে একজায়গায় চা খেতে দাঁড়িয়েছি । দোকানীর চারধারে  পানজর্দা , আতরের সুগন্ধ মেশানো এ পরিমন্ডল । আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় । আমার এক জ্যাঠাতো ভাই শৈশবে আমাদের বাসায় থাকতেন । দুই তিন খিলি পান এক সঙ্গে মুখে পুরে চিবোতেন তিনি । তিনি বাড়ীতে আমাদের পড়াতেন । শক্ত শক্ত অঙ্ক কি অনায়াসে কষে দিতেন । ফেরীতে উঠেছি । নদীর জল তখন স্থির , শান্ত । বহু দুর পর্যন্ত শান্ত মহা নীলাকাশ । দিগ্বলয়ে হস্তীযূথের মতো মেঘখন্ড চলে যাচ্ছে । নদীর জলের ওপর রোদের মিতালি । যত এসে পড়ছি ইট কাঠের হৃদয়হীন এ শহরে ততই ছোট গিন্নীর ছোখ চকচক করছে । অজানা বিস্ময়ে !

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট

Theme Customized BY LatestNews