পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়া পাড়া গ্রামের এক সাধারণ নারী— পবিত্রা রানী। কিন্তু তার জীবনগল্প মোটেও সাধারণ নয়। এটি সংগ্রাম, সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের ভাগ্য নিজেই বদলে ফেলার এক অসাধারণ উদাহরণ।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে পবিত্রা রানীর বিয়ে হয়। শৈশবের স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই তিনি পা রাখেন সংসারের কঠিন বাস্তবতায়। বিয়ের এক বছরের মাথায় জন্ম নেয় তার কন্যা সন্তান মিষ্টি রানী, এবং তিন বছরের মধ্যে আরেকটি সন্তান। স্বামী ছিলেন একজন ভ্যানচালক— তাও আবার ভাড়ায় চালানো প্যাটেল ভ্যান। সংসারের একমাত্র উপার্জন ছিল সেই সামান্য আয়, যা দিয়ে কোনোভাবে দিন চলতো, আবার অনেক দিন চলতো না।
অনেক সময় ঘরে চাল থাকলেও থাকতো না কোনো সবজি বা তরকারি। মাছ বা মাংস ছিল বিলাসিতা। দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সংগ্রাম ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। অভাবের এই কঠিন সময়ে পবিত্রা রানী থেমে থাকেননি। ছোট দুই সন্তানকে রেখে তিনিও বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। স্বামী-স্ত্রীর সামান্য আয়ে কোনোভাবে দিন কাটছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত।
এই অন্ধকারের মাঝেই ২০২১ সালে পবিত্রা রানীর জীবনে আসে আশার আলো। তিনি Women Ending Hunger সমিতির সদস্য হিসেবে যুক্ত হন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন পথচলা। তিনি বুঝতে শেখেন— সঞ্চয়, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতাই পারে জীবনের পরিবর্তন আনতে। নিজের সামান্য আয় থেকে তিনি নিয়মিত সঞ্চয় শুরু করেন।
সমিতির সহযোগিতায় তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। ২০২৩ সালে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে গবাদিপশু পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ থাকলেও তার বাড়িতে গরু পালনের মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। স্থানীয় সংগঠন বন্ধন কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতি থেকে তেভাগা পদ্ধতিতে একটি গরু লিজ নিয়ে শুরু করেন তার গবাদিপশু পালনের যাত্রা।
এভাবেই ধীরে ধীরে তার জীবনে আসে নতুন সম্ভাবনা। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিকশিত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এবং Women Ending Hunger-এর কম্পোস্ট প্রকল্প দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। তিনি কম্পোস্ট তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং নিজের আয়ের নতুন পথ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
নিজের সীমিত সঞ্চয় দিয়ে তিনি প্রথমে ১০টি চারি (কম্পোস্ট তৈরির পাত্র) ক্রয় করেন। গরুর গোবর সংগ্রহ করে এবং স্থানীয়ভাবে কেঁচো সংগ্রহ করে শুরু করেন তার ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন। শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। নিজের কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে তার প্রকল্পকে সম্প্রসারিত করেন।
আজ সেই ১০টি চারি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫টি চারিতে। ২০২৫ সালে তার এই কম্পোস্ট প্রকল্প থেকে তিনি প্রায় ২৫,০০০ টাকা লাভ করেছেন। বর্তমানে তার কাছে প্রায় ২,০০০ কেজি কম্পোস্ট সার মজুদ রয়েছে, যা বিক্রির জন্য প্রস্তুত।
যে নারী একসময় সন্তানের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতেন, আজ তিনি নিজের আয়ে সংসার চালাচ্ছেন, সঞ্চয় করছেন এবং সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। তার স্বামীও এখন তার এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছেন।
পবিত্রা রানীর জীবনে এখন ফিরেছে আশার আলো। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, সঠিক সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন নারীও হয়ে উঠতে পারেন নিজের পরিবারের পরিবর্তনের অগ্রদূত।
পবিত্রা রানীর গল্প শুধু একজন নারীর সফলতার গল্প নয়, এটি সংগ্রাম থেকে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।