জলের আয়নায় মুখ দেখার জন্য উদগ্রীব ছিলাম অনেকদিন। আলুটিলায় চেঙ্গি নদীর পাড়ে গিয়ে মনে হল, মুখ তো নয় যেন ডারউইন বাবুর শাখামৃগ। তাই খুঁজে খুঁজে চলে এলাম খাগড়াছড়ি। শুনেছি এখানে মাইনী নামে বইছে এক টলটলে জলের নদী যে জলে মুখ দেখলে প্রশান্ত হয়ে ওঠে হৃদয়মন্দির।
আহা এ তো নদী নয় আকাশের অনন্ত আয়না মেঘের নাওয়ের পাল ভাসা স্নিগ্ধ জলের নহর। পা ডুবিয়ে দিলে সারা গায় শিহরণ খেলে যায়। এত রকমারি পাখির সুমধুর ডাক ভেসে ভেসে মাইনী এক কিচির মিচিরের সরোবর।
খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালায় মাইনীর উৎপত্তি। এরপর ১০৯ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে এই নদী কাপ্তাই হ্রদে পড়েছে।মাইনীর প্রশস্ততা গড়ে ৬৫ মিটার। গভীরতা ৫-৮ মিটার। টলটলে জলের স্বচ্ছতায় এই নদী এখনো জীবন্ত। খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির নিসর্গ ও নান্দনিক আবহের অনেকখানি এই মাইনীর অবদান। এই নদীর স্বচ্ছতোয়া জলের ঝিলিকে অবারিত সবুজ আর উর্বরা দুইতীরের বিস্তীর্ণ আবাদভূমি। মাইনীর পাহাড়ি নাম মা।
জনশ্রুতি আছে, ত্রিপুরা জনজাতি জলের জন্য জলদেবতার প্রার্থনায় মিলিত হয় তাঁদের দীর্ঘ প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে জলদেবতা এই নদীর বন্দোবস্ত করেন। প্রথম প্রবাহের সময় এক শিশু আনন্দে আপ্লুত হয়ে মাইনী শব্দ উচ্চারণ করেন। সেই থেকেই এই নদীর মাইনী নাম।
৬০ দশক পর্যন্ত মাইনী নদীর তীরবর্তী এলাকা ছিল রিজার্ভ। সাধারণ মানুষের বসতি তৈরির অনুমোদন ছিল না। ১৯৬০ কাপ্তাই বাঁধের কারণে উদ্বাস্তু হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাঁদের নিয়েই মাইনী নদীর পাড়ে জনবসতির শুরু। জন্ম নেয় এক নতুন জনপদ দীঘিনালা। যার সম্পূর্ণ ভর মাইনীর উপরেই ছিল। উদ্বাস্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ বুকে নিয়ে মাইনী তাঁদের চোখে স্বপ্ন বুনে দিয়েছে। বীজ পুঁতে রাখলেই ফসল দিতে কার্পণ্য করেনি সে। চারা ফেলে রাখলেও অবলীলায় বৃক্ষ করে দিয়েছে এই নদীর মমতা।
দীঘিনালার প্রাণ। উড়ে উড়ে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছে কাপ্তাই লেক অবধি। আগেকার প্রমত্ত মাইনী এখন চোখে পড়ে না। বর্ষায় সে দুকুল ছাপিয়ে ফসল তলিয়ে নেয় ঠিকই। কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময়ে সে বড় ম্রিয়মাণ জড়সড়। বাহারী ফসলের পরিবর্তে এই নদীর দুই তীরে এখন কেবল তামাক আর তামাক। তামাক চাষে দরকার প্রচুর পরিমান রাসায়নিক সার আর কীটনাশক। সার আর কীটনাশক মিলে ভালো তামাক জন্মায় কিন্তু মরে যাচ্ছে মাইনীর সকল মাছ আর জীব বৈচিত্র্য। তৃণ আর গুল্মের লাগাতার বিনাশ মাইনীর গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে। আমাদের পাহাড়ি কইন্না মাইনী ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। দীঘিনালার লক্ষ লক্ষ তামাকের চুলায় মাইনী নদীও বাস্পায়িত হয়ে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে।
পাহাড়ে ও সমতলে দুইদিকেই মাইনী নদী। সেতু না থাকায় অনেক ঘুর পথ পেরিয়ে এখানকার বিদ্যার্থীরা পড়তে যায়। পাহাড়ি অংশে দুর্ঘটনা এখন নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। শত শত কৃষি ও কৃষকের গ্রামের নদী মাইনী। মাইনী নদী অনেক অভিসার ও প্রেমগাথার সরব সাক্ষী। কবিতা ও গল্পে এই নদীর কথা আছে কিন্তু এসব স্থানীয় ভাষায় লিখিত হবার কারণে প্রমিত প্রজাতি এসবের সন্ধান পায় না…